রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সংকট নয় বছরে এসে আরও জটিল রূপ নিয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর থেকে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাস অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ জন এবং ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন অবস্থান করছে।

নয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের বাস্তব পথ এখনো তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ অধিকার এবং সেখানে তাদের নিরাপদভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের আগস্টে মিয়ানমার জানিয়েছে, বাংলাদেশ পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে তারা ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। তবে মিয়ানমারের বক্তব্য অনুযায়ী, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে না। একই সঙ্গে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলেও দেশটি জানিয়েছে।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় জটিলতা এখানেই। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য শুধু সীমান্ত পার করে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দেওয়াই সমাধান নয়। তারা ফিরে গিয়ে কোথায় থাকবে, তাদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে, নিজেদের গ্রামে ফিরতে পারবে কি না, জীবিকা কীভাবে চলবে এবং তাদের মৌলিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব প্রশ্নের বাস্তব সমাধান না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এর মধ্যে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে যে ভূখণ্ডে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা, সেখানেই এখনো নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ঘাটতি রয়েছে। মিয়ানমারও সাম্প্রতিক বক্তব্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতিকে প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। উখিয়া ও টেকনাফে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পানি ও পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষকে এই সংকটের সঙ্গে বসবাস করতে হচ্ছে। একই এলাকায় এত বিপুল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি স্থানীয় সম্পদ ও সেবার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
এই চাপের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক মানবিক পরিকল্পনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চেয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনও পূরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতিও সংকটকে আরও কঠিন করে তুলছে। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, চিকিৎসা, পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। সেই সহায়তা কমে গেলে একদিকে রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও বাড়তি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো, নতুন করে মিয়ানমার থেকে মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা এখনো শেষ হয়নি। ফলে পুরোনো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি, আবার রাখাইনের সংঘাত অব্যাহত থাকায় নতুন বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
ফলে নয় বছর পর এসে রোহিঙ্গা সংকট আর কেবল একটি শরণার্থী সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাংলাদেশের মানবিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষও দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের প্রভাব বহন করছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্যও দীর্ঘদিনের ক্যাম্পজীবন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু কাগজপত্র যাচাই যথেষ্ট নয়। ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার যাচাই করেছে—এটি প্রশাসনিকভাবে একটি অগ্রগতি হলেও বাস্তবে তাদের ফেরার পথ এখনো নিরাপদ হয়নি। নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, বসবাসের নিশ্চয়তা, জীবিকা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
নয় বছর পর তাই প্রশ্ন শুধু রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে—তা নয়। প্রশ্ন হলো, তারা যখন ফিরবে তখন কি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজেদের ভূমিতে বসবাস করতে পারবে? আর প্রত্যাবাসনের সেই দিন আসা পর্যন্ত বাংলাদেশ কীভাবে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাবে?