লগইন
লগইন

হরমুজ নিয়ে ইরান ভুল হিসাব করেছে: সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালির ভূরাজনীতিতে তেহরান কৌশলগতভাবে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পেন্টাগনের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মূল্যায়ন তুলে ধরেন পেন্টাগনের আরব উপদ্বীপ বিষয়ক সাবেক পরিচালক ডেভিড ডেস রোচেস। বর্তমানে তিনি নিয়ার ইস্ট সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সামরিক প্রস্তুতির বর্তমান বাস্তবতায় কৌশলগত এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজে বাধা দেওয়ার ইরানের পূর্বের সেই সক্ষমতা আর আগের মতো কার্যকর নেই।

মার্কিন এই বিশ্লেষক আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ওয়াশিংটন যখন তাদের বিশাল তেল ট্যাঙ্কার বহরকে সামরিক নিরাপত্তার মাধ্যমে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সচেষ্ট হয়, তখন তেহরান কার্যত নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ জলসীমায় যেসব হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বড় কোনো ধাক্কা দেওয়া যায়নি। বরং এসব হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল কোনো নির্দিষ্ট তৃতীয় দেশের বিচ্ছিন্ন কিছু বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জলযান, যা সামগ্রিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্লেষণে ডেভিড ডেস রোচেস মার্কিন অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থানের দিকটিও তুলে ধরেছেন যা তেহরানের হিসাবনিকাশকে ভুল প্রমাণ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯২ ডলারে অবস্থান করছে, অথচ সংকট শুরুর প্রাক্কালে এর দাম আড়াই শ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হয়েছিল। একই সময়ে মার্কিন শেয়ারবাজারের সূচকগুলো রেকর্ড উচ্চতা স্পর্শ করেছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদনও নতুন মাইলফলক অর্জন করেছে। তার মতে, জ্বালানি খাতসহ সার্বিক অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের বিপর্যয় ও ধসের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, মার্কিন প্রশাসনের সুচারু পদক্ষেপে তা সফলভাবে এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে এই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, তেহরান যদি নতুন করে কোনো সামরিক সংঘাতে জড়ায়, তবে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও সর্বাত্মক হবে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহার উপযোগী দ্বৈত অবকাঠামোগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সামরিক শক্তি ও সরঞ্জাম পুনর্গঠনের সক্ষমতা প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে, যা পরবর্তী সংঘাতের সময় দেশটির জন্য বড় ধরনের দুর্বলতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

সবশেষে তিনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতির মধ্যকার মৌলিক কৌশলগত পার্থক্যের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন। তার মতে, তেল আবিব তেহরানে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন এবং তাদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে ইরানকে দেখতে চাইলেও ওয়াশিংটন ইরানকে কেবল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি বলেই বিবেচনা করে। ফলে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে তেহরানকে বিরত রাখা এবং তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক দুর্বল করার অভিন্ন লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর দুই মিত্র দেশের অবস্থান আলাদা হয়ে যেতে পারে। তখন ইসরাইল চূড়ান্তভাবে ইরানের সামরিক হুমকি চিরতরে মুছে ফেলতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের দিকেই বেশি মনোযোগী হবে।

মন্তব্য করুন