শিক্ষকদের ব্যস্ততা আর শিক্ষার্থীদের চিরচেনা কোলাহলের ভিড়ে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ধরে এক অনন্য মায়াবী বন্ধন তৈরি করেছিলেন শেফালী বেগম। নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর প্রথম উচ্চবিদ্যালয়ে আয়া পদে কর্মরত থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় ‘শেফালী খালা’। দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি কোমলমতি শিশুদের টিফিনের খোঁজ নিতেন এবং অসুস্থ শিক্ষার্থীদের পরম যত্নে আগলে রাখতেন। কারও কোনো ভুলত্রুটি হলে তিনি অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে তা শুধরে দিতেন, যা বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক পারিবারিক আবহ তৈরি করেছিল।
সম্প্রতি এই বিদগ্ধ বিদ্যালয়টিতে অনুষ্ঠিত হয় শেফালী বেগমের বহু প্রতীক্ষিত ও আবেগঘন শেষ কর্মদিবস। তাঁর দীর্ঘ সেবা ও আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীরা মিলে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। অনুষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম মিঠুর সভাপতিত্বে প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুল ইসলামসহ অন্যান্য বিশিষ্টজনেরা বক্তব্য রাখেন। বক্তারা শেফালী বেগমের সুদীর্ঘ কর্মজীবনের নানা স্মৃতিচারণ করেন এবং তাঁর আন্তরিক সেবার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
জীবনের দীর্ঘ সময় অবিবাহিত থাকা শেফালী বেগম বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতোই ভালোবেসে গেছেন এবং তাদের সব সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিদায়লগ্নে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান যে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই অন্তহীন ভালোবাসাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ও প্রাপ্তি। অনুষ্ঠান চলাকালীন তাঁকে সম্মাননা স্মারক, নগদ অর্থ এবং বিভিন্ন উপহারসামগ্রী দিয়ে সিক্ত করা হয়। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত সকলে তাঁকে উত্তরীয় পরিয়ে দিয়ে সম্মান জানান এবং তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের সুস্বাস্থ্য কামনা করেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এক ব্যতিক্রমী ও মনোমুগ্ধকর আয়োজনের মাধ্যমে তাঁকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেন। একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে শেফালী বেগমকে রাজকীয় কায়দায় বিদায় জানানো হয়। ঘোড়ার গাড়ি যখন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ত্যাগ করছিল, তখন চারদিকে এক হদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে এবং বহু শিক্ষার্থীর চোখেই আনন্দের ও বিদায়ের অশ্রু ঝরে পড়ে।