নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী বন্যা এবং ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনায় নিখোঁজ থাকা ৫৫ জন মালয়েশিয়ান নাগরিকের মধ্যে একজনকে দীর্ঘ ৩৭ দিন পর জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গেছে। হিমালয়ের দুর্গম ল্যাংটাং লিরুং পর্বতমালা সংলগ্ন এলাকায় হিমবাহ ধসে এই মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছিল এবং এর ফলে সমগ্র অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খোঁজ না পাওয়ার পর চীনা বংশোদ্ভূত ওই মালয়েশিয়ান পর্যটক সম্পূর্ণ নিরাপদে নিজের দেশে ফিরে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এত দীর্ঘ সময় পর একজন নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হওয়ায় অন্যান্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের হতাশ পরিবারের মনে নতুন করে আশার আলো জেগে উঠেছে।
‘মালয়েশিয়া সলিডারিটি: ফ্যামিলিজ ইন হোপ’ বা মাসফি নামক সংগঠনের মুখপাত্র মনিভান্নান রেথিনাম সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই রোমাঞ্চকর উদ্ধারের বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান যে একা একা নেপাল ভ্রমণে যাওয়া ওই নাগরিক কাঠমান্ডুস্থ মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক মিশনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজের নিরাপদ অবস্থার কথা সবাইকে অবহিত করেছেন। এর আগে গত ২৭ আগস্ট মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল যে নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডুস্থিত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় মোট ৫৫ জন মালয়েশিয়ান নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ ওই পর্যটক বন্যার ঠিক একদিন আগে অর্থাৎ গত ২৫ আগস্ট বিকেলে নাগথালি ভিউপয়েন্টে অবস্থান করছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপসংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ল্যাংটাং লিরুং পর্বতে সংঘটিত হিমবাহ ও বরফ ধসের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এর ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল। এই ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক তাণ্ডবের কারণে নেপাল ও সংলগ্ন তিব্বতীয় অঞ্চলে ইতিমধ্যে চৌদ্দশ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনো প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া, সড়ক ও সেতু ভেঙে পড়া এবং বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির তীব্র সংকটের কারণে ওই পর্যটক দুর্গম অঞ্চলে দীর্ঘদিন আটকা পড়েছিলেন। পাহাড়ি এলাকায় রাস্তাঘাট এবং নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় উদ্ধারকারী দলগুলোর পক্ষেও সেখানে পৌঁছানো অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছিল।
নেপালের পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এই বিপর্যয়ের পর ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের ত্রিশটিরও বেশি দেশের অনেক নাগরিক এখনো নিখোঁজ অবস্থায় রয়েছেন। নিখোঁজ এসব বিদেশি নাগরিকদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয়, আমেরিকান, ইউক্রেনীয় এবং চীনা নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন যাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো অনিশ্চিত। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে এ পর্যন্ত চৌদ্দশর বেশি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ডিএনএ পরীক্ষার নানা জটিলতার কারণে মৃতদেহগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত শুকিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে নেপাল সরকারের প্রায় পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সহায়তা প্রয়োজন হবে।