রাজনীতি ডেস্ক: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের রাজনৈতিক দল গঠন করাকে একটি বড় ভুল হিসেবে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তাঁর মতে, কোনো অভ্যুত্থানের সুফল একদিনে পাওয়া সম্ভব নয় এবং এর প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এই মতামত ব্যক্ত করেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও চব্বিশের ছাত্র-জনতা আন্দোলনের বীরেরা অংশ নেন।
আলোচনায় বক্তৃতাকালে ড. দিলারা চৌধুরী জানান, অভ্যুত্থানের পর পরই সবকিছুর রাতারাতি পরিবর্তন প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। সমাজ সংস্কার এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময় ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়। তিনি কিউবা, রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের উদাহরণ টেনে বলেন যে, যেকোনো বড় সামাজিক রূপান্তরের সুফল পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়। কিন্তু জুলাইয়ের তরুণ নেতারা দল গঠনের ক্ষেত্রে সেই পর্যাপ্ত সময় ও প্রস্তুতি নিতে পারেননি বলে তিনি মনে করেন।
তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিভক্তির বিষয়টি তুলে ধরে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, আন্দোলনের সময় যে অটুট ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা পরবর্তীতে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক দল রাতারাতি গঠন করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর জন্য তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ও সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু জুলাইয়ের শীর্ষ নেতারা দল গঠনের তাড়াহুড়ো করে ভুল করেছেন এবং তাদের রাজনৈতিক পরিপক্বতার জায়গাতেও ঘাটতি ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে দেশের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও নিজের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন দিলারা চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সময় স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত বা একপেশেভাবে উপস্থাপন করা হয়, যার ফলে জনগণের আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন হয় না। গত পাঁচ দশকে দেশের সমাজে নানা ধরনের অনৈক্য, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ শক্তিকে দুর্বল করে বাইরের শক্তির প্রভাব বিস্তারের পথ প্রশস্ত করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহিদুল আলম এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়াসহ অনেকে। সভা শেষে বক্তারা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে আলোচনা করেন।