লগইন
লগইন

ব্যাংক বাঁচানোর ‘জরিমানা’ জনগণ দেবে, বিনিময়ে কী পাবে

অর্থনীতি ডেস্ক: অতীতের বিভিন্ন সময়ে নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন লুটপাট চালানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তা এবং তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এর জেরে দেশের আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যা বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। এই বিশাল পরিমাণ খেলাপি ঋণের সিংহভাগই কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে হাতে গোনা কয়েকটি বড় ব্যাংকের কাছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপির রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং এর সম্পূর্ণ দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এড়াতে পারে না।

এই নজিরবিহীন তছরুপের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এখন সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা চাপানোর প্রস্তুতি চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ধসে পড়া ব্যাংক খাত পুনর্গঠন করতে আগামী কয়েক বছর প্রতিবছর বড় অঙ্কের অর্থ জোগান দিতে হবে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ বিদেশি কোনো দাতা সংস্থা বা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান অনুদান বা সহজ শর্তে দিচ্ছে না, কারণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো লুটপাটের ক্ষতি পূরণে সরাসরি অর্থ সহায়তা প্রদানে রাজি নয়। ফলে একমাত্র বিকল্প হিসেবে সাধারণ মানুষের করের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়েই এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। মাথাপিছু হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিটি নাগরিককে এই অব্যবস্থাপনার কারণে বিশাল অঙ্কের আর্থিক জরিমানা গুণতে হচ্ছে।

জনগণের করের টাকায় ব্যাংক উদ্ধারের এই উদ্যোগের নৈতিকতা এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলা হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ বা পরিবারতন্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যে ভিন্নমুখী অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। সংস্কারের এই ধীরগতি ও নমনীয় মনোভাব প্রমাণ করে যে আর্থিক খাতকে জনবান্ধব ও স্বচ্ছ করার চেয়ে প্রভাবশালী মহলের স্বার্থরক্ষা করার প্রবণতা এখনো রয়ে গেছে।

শুধুমাত্র জনগণের অর্থে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করলেই পুরো খাতের সমস্যার সমাধান হবে না, যদি না কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা হয়। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সুইডেনের মতো দেশগুলো অতীতে তাদের আর্থিক সংকট উত্তরণে কঠোর একীভূতকরণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গঠন এবং খেলাপি ঋণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পথ বেছে নিয়েছিল। সুতরাং, জনগণের করের অর্থ ব্যবহারের আগে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের এই আর্থিক জরিমানা প্রদান কেবল ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

মন্তব্য করুন