লগইন
লগইন

১৩.৮ বিলিয়ন বছর বয়সী মহাবিশ্ব কীভাবে ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষজুড়ে বিস্তৃত

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী আমাদের এই মহাবিশ্বের বয়স প্রায় তেরো দশমিক আট বিলিয়ন বছর। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ হিসেবে মনে হতে পারে যে আলো কেবল তেরো দশমিক আট বিলিয়ন বছর ধরে পথ চলার সুযোগ পেয়েছে। ফলে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ বিস্তৃতিও এতটুকুই হওয়ার কথা। কিন্তু আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের নানা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কথা। বাস্তবে আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ছিয়ানব্বই বিলিয়ন আলোকবর্ষ। আপাতদৃষ্টিতে এই বিষয়টি অসম্ভব ঠেকলেও এর পেছনে রয়েছে স্থানকালের ক্রমাগত প্রসারণের এক আশ্চর্য বৈজ্ঞানিক রহস্য।

মহাবিশ্ব যদি একটি স্থির ও অপরিবর্তিত বস্তু হতো, তবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব এবং তার বয়স নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হতো না। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং এটি প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। গ্যালাক্সিগুলো কেবল মহাকাশের ভেতর দিয়ে নিজেদের গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে না, বরং গ্যালাক্সিগুলোর মাঝখানের খালি জায়গাটাই আকারে ক্রমশ বড় হচ্ছে। বেলুনের গায়ে দুটি ফোঁটা এঁকে বেলুনটি ফোলালে যেমন ফোঁটাগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব বেড়ে যায়, মহাবিশ্বের প্রসারণের বিষয়টিও ঠিক তেমনিভাবে কাজ করে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক দূরত্ব পরিমাপের ক্ষেত্রে কোমুভিং দূরত্বের ধারণা ব্যবহার করে থাকেন। এই বিশেষ পরিমাপপদ্ধতি মহাবিশ্বের স্থান প্রসারণের প্রভাবকে বাদ দিয়ে দুটি বস্তুর মধ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রসারণের হারকে ধ্রুবক হিসেবে ধরে রাখে। আলো যখন কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে পৃথিবীর দিকে যাত্রা করে, তখন মাঝখানের স্থান নিজেই প্রসারিত হতে থাকে। এর ফলে আলোর মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব কেবল সময় ও আলোর বেগের সাধারণ গুণফল থাকে না। শুরুর দিকের ক্ষুদ্র মহাবিশ্বের সেই সামান্য দূরত্ব মহাজাগতিক প্রসারণের হাত ধরে বর্তমান সময়ে এসে বিশাল এক কোমুভিং দূরত্বে রূপ নেয়।

মহাবিশ্বের এই সুদূর অতীত উন্মোচনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি। বিগ ব্যাংয়ের প্রায় তিন লাখ আশি হাজার বছর পর মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসার ফলে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসগুলো যুক্ত হয়ে স্থায়ী পরমাণু গঠন করে। কুয়াশা কেটে যাওয়ার মতো মহাবিশ্ব তখন প্রথমবারের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে এবং আলোককণাগুলো মহাশূন্যে মুক্তভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইটে ধারণকৃত এই প্রাচীন বিকিরণের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ থেকেই বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের বয়স তেরো দশমিক আট বিলিয়ন বছর বলে নিশ্চিত হয়েছেন।

তবে এই ছিয়ানব্বই বিলিয়ন আলোকবর্ষের বিশাল পরিধি কিন্তু সমগ্র মহাবিশ্ব নয়, এটি কেবল আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য অঞ্চলের সীমানা। পৃথিবী কোনো বিশেষ কেন্দ্রীয় স্থানে অবস্থিত নয় এবং মহাবিশ্বের অন্য যেকোনো স্থান থেকেও নিজস্ব একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য জগৎ রয়েছে। কণা দিগন্তের বাইরে বা এই সীমার ওপারে আরও কী রয়েছে, তা আলো এখনো আমাদের কাছে না পৌঁছানোর কারণে সরাসরি দেখা সম্ভব নয়। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের দৃশ্যমান এই সীমার বাইরেও পুরো মহাবিশ্বটি অবিশ্বাস্য রকম বিশাল কিংবা অসীম বিস্তৃতি নিয়ে ছড়িয়ে থাকতে পারে।

মন্তব্য করুন