শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা ও বাজেট কমানোর প্রতিবাদে ফ্রান্সে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তীব্র সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কারের দাবিতে প্রথমে রাজধানী প্যারিসে এই বিক্ষোভ শুরু হলেও তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের এই কর্মসূচি ঘিরে দেশজুড়ে সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যার ফলে সাতশটিরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করায় দেশজুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলমান সহিংসতা ও দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সম্ভাব্য সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বিচারমন্ত্রী জেরাল দারমানিন উল্লেখ করেছেন যে, দেশের তিন হাজারেরও বেশি স্কুল এই সহিংস বিক্ষোভের কারণে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে থাকায় বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ চড়াও হয়েছে এবং বেশ কিছু এলাকায় কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ রেন ও স্ত্রাসবুর্গ শহরে বিক্ষোভকারীরা আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেলফোর শহরে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে মাটিতে ফেলে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সতেরো বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে অন্তত ৬৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য আন্দোলনকে কতিপয় বহিরাগত ও দুর্বৃত্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সহিংসতা চালাচ্ছে। নঁতের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় ২০ লাখ ইউরোর বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে আঞ্চলিক সূত্রে জানা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ অনেক অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। এদিকে ফরাসি সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, স্কুল ভাঙচুরের মতো সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের অভিভাবককেই আইনি প্রক্রিয়ায় মেরামতের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর প্রশাসনের জন্য এই আন্দোলন একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে সামনে নির্বাচন থাকায় পরিস্থিতি বেশ স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। তবে দেশটির বেশ কিছু বড় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শিক্ষক সংগঠন শিক্ষার্থীদের এই দাবির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে। তারা শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকারের পক্ষে জোালালো অবস্থান নিয়েছে এবং প্রশাসনের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা আগামী দিনে ফরাসি রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।