ইরানে হিজাব পরিধান না করে প্রকাশ্য কনসার্টে গান পরিবেশন করার অপরাধে জনপ্রিয় এক নারী সংগীতশিল্পীকে দেওয়া কঠোর সাজা উচ্চ আদালতে বহাল রাখা হয়েছে। দেশটির আপিল আদালত কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শুনানি ছাড়াই ২৯ বছর বয়সী তরুণী শিল্পী পারাস্তু আহমাদির বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতের দেওয়া ৭৪টি দোররা মারার রায় বহাল রাখেন। আইনজীবীদের বরাਤੇ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত বছর ডিসেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সরাসরি সম্প্রচারিত কনসার্টে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁকে এই আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়। ওই অনুষ্ঠানে তিনি হিজাব পরিহার করে স্লিভলেস বা হাতাছাড়া পোশাকে গান গেয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখ লাখ মানুষের নজর কাড়ে।
ইরানি আইন অনুযায়ী নারীদের প্রকাশ্যে এককভাবে গান গাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং জনসমক্ষে নারীদের জন্য হিজাবসহ শালীন পোশাক পরা বাধ্যতামূলক। পারাস্তু আহমাদির সেই পরিবেশনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরপরই দেশটির বিচার বিভাগ নড়েচড়ে বসে এবং এটিকে আইন ও সাংস্কৃতিক বিধানের চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং কোম প্রদেশের একটি ফৌজদারি আদালত তাঁকে ও তাঁর ব্যান্ডের আট সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে অশ্লীল কনটেন্ট প্রকাশের মাধ্যমে জনশালীনতা ভঙ্গের অভিযোগ আনেন এবং পারাস্তুকে দোররা মারার পাশাপাশি আগামী দুই বছর সব ধরনের অডিও-ভিজ্যুয়াল কার্যক্রম পরিচালনা ও দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হলেও বিচারকরা কোনো ধরনের শুনানি গ্রহণ না করেই তা সরাসরি খারিজ করে দেন। আহমাদির আইনি প্রতিনিধিরা জানান, তাঁরা এই কনসার্ট আয়োজনকে কোনো অপরাধ হিসেবে মনে করেন না এবং এই ধরনের ক্ষেত্রে কেবল আর্থিক জরিমানা বা লঘুদণ্ড দেওয়ার বিধান থাকার পরও বিচারকরা সবচেয়ে কঠোর শাস্তি বেছে নিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই দৃষ্টান্তমূলক ও ভীতিপ্রদ শাস্তির মূল উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে যেন অন্য কোনো শিল্পী এমন সাহস দেখানোর পুনরাবৃত্তি না করতে পারেন। আইনি প্রক্রিয়ায় এই কঠোরতা বজায় রাখার ফলে দেশটির শিল্পী সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে ইরানি সংগীতশিল্পীর বিরুদ্ধে এমন মধ্যযুগীয় ও কঠোর সাজা ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। নির্বাসিত জনপ্রিয় ইরানি কণ্ঠশিল্পী গুগুশ ইনস্টাগ্রামে নিজের প্রতিক্রিয়ায় আশা প্রকাশ করেছেন যে এই অন্ধকার দিনগুলোর অবসান ঘটবে এবং নারীরা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ও পোশাকের স্বাধীনতা ফিরে পাবেন। পাশাপাশি খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ হোসেইন আলিজাদেহ সংহতি প্রকাশ করে ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি পারাস্তুর পরিবর্তে নিজের শরীরে এই দোররা সহ্য করতে প্রস্তুত রয়েছেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই অমানবিক সাজাকে চরম নিষ্ঠুর এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।