রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় ফুটপাত দখল করে কম দামে খাবার বিক্রির সুবাদে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া মিজানুর রহমান সম্প্রতি ফের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানের মুখে পড়েছেন। মাস দেড়েকের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো তাঁর রান্নার চুলা ও জ্বালানি কাঠ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যম বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার ছাড়াই তিনি কীভাবে এত পরিচিতি পেলেন, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট নির্মাতাদের কল্যাণে তিনি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এবং পরিচিতি পান ভাইরাল মিজান হিসেবে।
মিজানের এই জনপ্রিয়তার পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে শত শত স্মার্টফোনের ক্যামেরা ও কনটেন্ট নির্মাতাদের উপচে পড়া ভিড়। ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল এবং টিকটকের বহু ক্রিয়েটর সারাদিন তাঁর দোকানের সামনে অবস্থান নিয়ে লাইভ ভিডিও ও রিলস তৈরি করতে থাকেন। ভিডিওগুলোতে বেশি ভিউ এবং আর্থিক লাভের নিশ্চয়তা থাকায় নির্মাতারা তাঁর দোকানের আশপাশেই ভিড় জমান। মাঝে মাঝে ক্যামেরার উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়ে মিজান তাদের ওপর চড়াও হলেও, তাঁর সেই রাগ ও ক্ষিপ্ত আচরণ অনলাইনে দর্শকদের আরও বেশি আকৃষ্ট করে এবং ভিডিওগুলোর প্রচার বাড়িয়ে দেয়।
এই কনটেন্ট বাণিজ্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিডিওগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও গরুর মাংসের চড়া দাম। বাজারে গরুর মাংসের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ দিনমজুর ও নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে তা কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলোতেও এক বাটি মাংস ও ভাতের দাম অনেক বেশি হওয়ায় ১০০ টাকায় পেটপুরে মাংস-ভাত খাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ক্রেতারা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। কম খরচে খাবার পাওয়ার এই সামাজিক হাহাকার এবং কৌতূহলই মূলত সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁর ভিডিওগুলো ভাইরাল করতে সহায়তা করেছে।
মিজানের জীবনের পেছনের গল্পটি দীর্ঘ সংগ্রাম ও কষ্টের মধ্য দিয়ে গড়া, যা তাঁর বর্তমান পরিচিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। ছোটবেলায় বরিশালের গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে মায়ের সঙ্গে নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া মিজান অতীতে রিকশা চালানো থেকে শুরু করে ফল বিক্রির মতো বিভিন্ন কাজ করেছেন। রিকশার গ্যারেজ ছেড়ে ভাত বিক্রির ব্যবসা শুরু করার পর কম দামে খাবার দেওয়ার বিষয়টি ক্রেতাদের নজর কাড়ে এবং অনলাইনে প্রথম ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর পরিচিতি বাড়তে শুরু করে। গত আগস্টে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাজে বাধা দেওয়ায় তাঁকে কারাবাস করতে হয় এবং জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ফুলের মালায় বরণ করার ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে কোটিবারের বেশি দেখা হয়।
মিজানের এই অর্জিত জনপ্রিয়তাকে বিশেষজ্ঞরা একধরনের সামাজিক পুঁজি হিসেবে দেখলেও এর নেতিবাচক দিক নিয়েও সতর্ক করেছেন। গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অ্যালগরিদম নীতি বা সত্যতা বিবেচনা না করে কেবল মানুষের আবেগকে পুঁজি করে কনটেন্ট ছড়িয়ে দেয়, যা অন্ধ জনপ্রিয়তার জন্ম দেয়। এই জনপ্রিয়তা হয়তো তাঁকে বারবার ফুটপাতে ফিরে আসার সাহস জুগিয়েছে, তবে একে পুরোপুরি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বলা চলে না। তাই কেবল অন্ধের মতো ভাইরাল ট্রেন্ডে ভেসে না গিয়ে এর পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটগুলো নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।