লগইন
লগইন
ফটো গ্যালারি

গ্রামবাংলার চেনা পাখি মাছরাঙা, কমছে কি বিচরণ?

একসময় গ্রামবাংলার পুকুর, নদী, খাল-বিল কিংবা ফসলের মাঠসংলগ্ন জলাশয়ে মাছরাঙার দেখা পাওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক। পানির ধারে কোনো গাছের ডাল কিংবা বাঁশের খুঁটিতে নিশ্চুপ বসে শিকারের অপেক্ষায় থাকত পাখিটি। পানিতে মাছের নড়াচড়া চোখে পড়লেই মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠোঁটে শিকার নিয়ে ফিরে আসত আগের অবস্থানে। প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য একসময় গ্রামীণ জীবনের পরিচিত অংশ হলেও বর্তমানে অনেক এলাকায় মাছরাঙার উপস্থিতি আগের তুলনায় কম চোখে পড়ে।

প্রকৃতির অন্যতম আকর্ষণীয় এই পাখির বিচরণ কমে যাওয়ার পেছনে জলাশয়ের দূষণ, প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মাছরাঙার পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

মাছরাঙার ইংরেজি নাম Kingfisher। তবে Alcedo atthis হলো কমন কিংফিশার বা সাধারণ মাছরাঙার বৈজ্ঞানিক নাম। মাছরাঙা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে আকার, রং ও স্বভাবের ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণত বড় মাথা, লম্বা ও সরু-সুচালো ঠোঁট এবং দ্রুত শিকার ধরার উপযোগী শারীরিক গঠন এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশে মাছরাঙার বিভিন্ন প্রজাতি দেখা যায়। নীল, সবুজ, বাদামি, লালচে ও সাদা রঙের বৈচিত্র্য পাখিগুলোকে সহজেই অন্য পাখির তুলনায় আলাদা করে চেনায়। প্রজাতিভেদে নদী, পুকুর, বিল, জলাভূমি থেকে শুরু করে বনাঞ্চলের বিভিন্ন পরিবেশে এদের বিচরণ রয়েছে। কিছু প্রজাতি জলাশয়ের পাড়ের মাটিতে সুড়ঙ্গ তৈরি করে বাসা বাঁধে।

নাম থেকেই মাছরাঙার প্রধান খাদ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। মাছ এদের অন্যতম প্রধান খাবার হলেও প্রজাতি ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে জলজ পোকামাকড়, চিংড়ি, ব্যাঙাচি এবং অন্যান্য ছোট প্রাণীও খেয়ে থাকে। সাধারণত জলাশয়ের পাশে কোনো উঁচু ডালে বা খুঁটিতে বসে শিকারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। উপযুক্ত শিকার দেখতে পেলেই দ্রুত পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠোঁটের সাহায্যে সেটিকে ধরে ফেলে।

আবাসস্থল সংকট ও খাদ্যশৃঙ্খলের ঝুঁকি

মাছরাঙার স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে জলাশয় ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু জলাশয়ের পানি দূষিত হওয়া, জলজ প্রাণীর সংখ্যা হ্রাস পাওয়া এবং গাছপালা ও উপযুক্ত বাসস্থানের অভাব এদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি কৃষিজমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জলজ ও স্থলজ খাদ্যশৃঙ্খলেও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে শুধু মাছরাঙা নয়, সেখানে নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীর জীবনও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তবে কোনো এলাকায় মাছরাঙার সংখ্যা সত্যিই কমছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রজাতিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

মাছরাঙা রক্ষায় করণীয়

প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে মাছরাঙার মতো বন্য পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য নদী, খাল, বিল ও পুকুরের দূষণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলাশয় ও আশপাশের গাছপালা রক্ষা করতে হবে। নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা এবং কৃষিতে কীটনাশকের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।

একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছরাঙার উপস্থিতি, বিস্তৃতি ও সংখ্যা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে পাখিগুলোর আবাসস্থল ও পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কোনো না কোনো ভূমিকা পালন করে। মাছরাঙাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই এই পরিচিত পাখির বিচরণ ধরে রাখতে হলে শুধু পাখিকে রক্ষা করলেই হবে না, বরং তার বেঁচে থাকার উপযোগী জলাশয়, খাদ্য ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলও সংরক্ষণ করতে হবে। গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে মাছরাঙার চিরচেনা উপস্থিতি টিকিয়ে রাখতে পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

স্থান:
  • রাজশাহী

মন্তব্য করুন